ইতিবাচক ধারায় এশিয়ার শেয়ারবাজার সূচক

যুক্তরাষ্ট্রে আশাতীত অর্থনৈতিক তথ্য ও শক্তিশালী আয় প্রতিবেদনের কারণে ওয়াল স্ট্রিটে শেয়ারবাজারের সূচক রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে এশিয়ার শেয়ারবাজারেও।

যুক্তরাষ্ট্রে আশাতীত অর্থনৈতিক তথ্য ও শক্তিশালী আয় প্রতিবেদনের কারণে ওয়াল স্ট্রিটে শেয়ারবাজারের সূচক রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে এশিয়ার শেয়ারবাজারেও। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস শুক্রবার এ অঞ্চলের বেশির ভাগ শেয়ারসূচকে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়। তবে কয়েকটি দেশে আসন্ন রাজনৈতিক ঘটনা ও অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা কিছুটা সতর্ক অবস্থানে থাকায় দেশগুলোর সূচক তুলনামূলক পিছিয়ে ছিল। খবর এপি।

জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক দশমিক ২ শতাংশ কমে ৩৯ হাজার ৮১৯ দশমিক ১১ পয়েন্টে নেমেছে। আগামীকাল দেশটিতে উচ্চকক্ষের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে ক্ষমতাসীন জোট সংসদের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে—এমন শঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা সাবধানী অবস্থানে রয়েছেন।

অন্যদিকে হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক ১ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৮০৫ দশমিক ৭৪ পয়েন্টে। চীনের সাংহাই কম্পোজিট সূচক বেড়েছে দশমিক ৩ শতাংশ। তাইওয়ানের শেয়ারবাজারেও ছিল ইতিবাচক প্রবণতা। দেশটির প্রধান সূচক টাইএক্স ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। এ প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে প্রযুক্তি খাত। তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি টিএসএমসির শেয়ারদর ২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় চুক্তিভিত্তিক চিপ নির্মাতা টিএসএমসি জানিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অন্যান্য প্রযুক্তিপণ্যের চাহিদা বাড়ায় তাদের নিট আয় গত প্রান্তিকে গত বছরের তুলনায় প্রায় ৬১ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার বৃহস্পতিবার বেড়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ।

অস্ট্রেলিয়ার এসঅ্যান্ডপি/এএসএক্স ২০০ সূচক বেড়েছে ১ দশমিক ৪ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক দশমিক ১ শতাংশ কমেছে, আর ভারতের সেনসেক্স সূচক কমেছে দশমিক ৭ শতাংশ।

এসপিআই অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের স্টিফেন ইনেস বলেন, ‘এশিয়া এখন বৈশ্বিক বাজার ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে উত্তেজনা এখনো কাটেনি। এমনকি মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভও এখন অনেকটা স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে। তবে এ ইতিবাচকতার আড়ালে বাজার এখনো বেশ অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং বিনিয়োগকারীরা বাজার অনেকটাই সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।’

ওয়াল স্ট্রিটে বৃহস্পতিবার এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৬ হাজার ২৯৭ দশমিক ৩৬ পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা এক সপ্তাহ আগের রেকর্ড ভেঙেছে। ডাও জোন্স সূচক দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৪৪ হাজার ৪৮৪ দশমিক ৪৯ পয়েন্টে এবং নাসডাক কম্পোজিট সূচক দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ২০ হাজার ৮৮৫ দশমিক ৬৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।

চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা ব্যয় প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বেড়েছে—এমন তথ্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশা জাগিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের ধারণা ছিল ব্যয় কিছুটা কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে বিপরীত চিত্র। এটিকে এখন মার্কিন অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এছাড়া গত সপ্তাহে বেকার ভাতার জন্য নতুন করে যেসব নাগরিক আবেদন করেছেন, সে সংখ্যা কমেছে। এটি শ্রমবাজার স্থিতিশীল আছে বলেই ধারণা দিচ্ছে।

অন্যদিকে, মধ্য আটলান্টিক অঞ্চলের উৎপাদন খাতে চমকপ্রদ অগ্রগতি দেখা গেছে। পূর্বাভাসে এখানে দুর্বলতা দেখানো হলেও বাস্তবে উৎপাদন বেড়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, দেশটির শিল্প খাত এখনো বেশ সক্রিয় এবং অর্থনৈতিক চাহিদা টিকে আছে।

এসব তথ্য ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) জন্য সুদহার অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে যুক্তি জোগাচ্ছে। বছরের শুরু থেকে ফেড সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে। তবে ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল জানিয়েছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত শুল্কনীতির প্রভাব ও মূল্যস্ফীতির তথ্য বিশ্লেষণ করে তবেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

সম্প্রতি এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ বা ফেড চেয়ারম্যানকে বরখাস্ত করার কথা ভেবেছিলেন। যদিও পরে তিনি বলেছেন, এখনই এমন কিছু করার সম্ভাবনা নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, তার এ বক্তব্যের ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সুদহার কমানোর আশা তৈরি হয়েছে। তবে এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব নীতি নির্ধারণে স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলেও তারা মনে করছেন।

এআই খাতসংশ্লিষ্ট অন্যান্য শেয়ারসূচক বেড়েছে। এনভিডিয়ার শেয়ারদর ১ শতাংশ বেড়েছে, যা এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় বড় ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে, পেপসিকোর শেয়ারমূল্য ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। তাদের আয় ও মুনাফা ওয়াল স্ট্রিটের পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে।

অর্থনীতির ভালো প্রতিবেদন সত্ত্বেও ট্রেজারি বন্ডের ফলন মিশ্র অবস্থানে রয়েছে, যা বাজারে ভবিষ্যৎ নীতির অনিশ্চয়তা নির্দেশ করে।

মুদ্রাবাজারে ১ ডলারের দর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৮ দশমিক ৭০ ইয়েনে। ইউরোর বিনিময় হার বেড়ে হয়েছে ১ ডলার ১৬ সেন্টে।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনগুলোয় বড় বড় কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক তথ্যের ওপর বিনিয়োগকারীদের সতর্ক পর্যবেক্ষণ বজায় থাকবে। শেয়ারবাজারে ইতিবাচক গতি বজায় থাকলেও মূল্যস্ফীতি, সুদহার ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মতো বিষয় এখনো বড় অনিশ্চয়তা হিসেবে রয়ে গেছে।

আরও